শতবর্ষে জনপ্রিয় প্রদীপ কুমার

অভিনয়ের দিকে  আগ্রহ থাকায় বাবা বলে দিলেন যদি ইচ্ছে থাকে তাহলে টেকনিশিয়ান হতে পারো, কিন্তু কখনোই ছবির জগতের অভিনেতা নয়।বাবার অমতে গিয়ে ছেলে অভিনেতাই হলেন। প্রথম দিকে তিনি কাজ করলেন বাংলা ছবিতে। পরে তিনি শুরু করলেন হিন্দি ছবিতে অভিনয়।

সেই ছেলেটি হলেন প্রদীপ কুমার। তাঁর জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ জানুয়ারি ভবানীপুর সর্দার শংকর রোডের পণ্ডিত বাড়িতে। পিতৃদত্ত নাম ছিল শীতল বটব্যাল। ঠাকুরদা বিদ্যালঙ্কার উমেশচন্দ্র ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বাড়িতে একটা অন্য রকমের পরিবেশ। সেখান থেকে সিনেমায় নায়ক হওয়ার কথা  ভাবাই যায় না। প্রদীপ কুমার গভর্মেন্ট আর্ট স্কুলের ছাত্র। ছেলের আগ্রহ দেখে বাবা সত্যেন্দ্রনাথ বলেই দিলেন ইচ্ছে থাকলে টেকনিশিয়ান হতে পারো  কিন্তু অভিনেতা কখনোই নয়। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে  তিনি অভিনেতাই হয়ে উঠলেন। সুদক্ষ আলোকচিত্র শিল্পী এস. মিত্রের  সঙ্গে দেখা করলেন প্রদীপ কুমার। তিনি পাঠিয়ে দিলেন পরিচালক দেবকী কুমার বসুর কাছে। রংমহল থিয়েটারে প্রদীপ কুমার অভিনীত ‘নতুন প্রভাত’ নাটকে প্রদীপকুমারের অভিনয় দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং তাঁকে  ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। বাড়িতে প্রচন্ড আপত্তি। জামাইবাবু অবশ্য উৎসাহ দিলেন। আর উৎসাহ দিলেন পিসেমশাই। বাড়ির কারো কথা শুনলেন না। সরোজ মুখার্জি প্রযোজিত ‘অলকানন্দা’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেলেন। পরিচালক দেবকী কুমার বসু। তিনি শীতল নাম বদলে তাঁর নতুন নাম দিলেন প্রদীপ কুমার। ছবি মুক্তি পেল ১৯৪৭ সালে। তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল।

হেমেন গুপ্তের পরিচালনায় পরপর দুটি ছবিতে প্রদীপ কুমারের অভিনয় সকলের মনে দাগ কাটল। ছবি দুটি হল ‘ভুলি নাই’ ও   ‘৪২’। পাশাপাশি অভিনয় করলেন অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায় পরিচালনায় ‘সন্দীপন পাঠশালা’ ছবিতে। এছাড়াও কাজ করলেন ‘দেবী চৌধুরানী’, ‘স্বামী’, ‘বিষ্ণুপ্রিয়া, ‘সন্ধ্যাবেলার রূপকথা’, ‘অপবাদ’, ‘পলাতক’, ‘স্পর্শমণি’ প্রভৃতি  ছবিতে।

আনারকলি ছবিতে প্রদীপকুমার
আনারকলি ছবিতে প্রদীপকুমার

হেমেন গুপ্ত যখন বোম্বেতে হিন্দি ছবির জগতে প্রতিষ্ঠার রূপ দেখছেন, তখন তিনি প্রদীপ কুমারকে ডেকে নিয়ে গেলেন বম্বেতে। সেখানে প্রখ্যাত প্রযোজক শশধর মুখার্জির ফিল্মিস্তান চিত্র সংস্থার সঙ্গে পাকাপাকিভাবে প্রদীপ কুমার পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেন। প্রদীপ কুমার হলেন কলকাতার প্রথম শিল্পী যিনি বোম্বে চিত্র জগতে নায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। বোম্বে সব বিখ্যাত নায়িকাদের বিপরীতেই তিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করলেন। যে তালিকায় আছেন মীনা কুমারী, নার্গিস, মধুবালা, গীতাবালি, বৈজয়ন্তীমালা, আশা পারেখ, ওহাদিয়া রহমান, মালা সিনহা, পদ্মিনী, রীনা রায়, শাকিলা, অনীতা গুহ, কল্পনাসহ বহু বিশিষ্ট নায়িকা। প্রদীপ কুমার অভিনীত বিখ্যাত  ছবিগুলোর মধ্যে  রয়েছে ‘চিত্রলেখা’, ‘নুরজাহান’, ‘আরতি, ‘বহু বেগম’,  ‘আনারকলি’, ‘তাজমহল’,‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘মিস ইন্ডিয়া’,  ‘আদালত’,  ‘ গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া’, ‘রাজহাট’, ‘নাগিন’,  ‘বাদশাহ’, ‘ঘুংঘট’, ‘ মেরি সুরত তেরি আঁখে’, ‘রাখি’, ‘মহাভারত’ প্রভৃতি ছবি।

বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে স্মরণীয় ছবিটি অবশ্যই সুচিত্রা সেনের বিপরীতে ‘গৃহদাহ’  নায়ক মহিমের চরিত্রে অবশ্য ছিলেন  উত্তম কুমার। এছাড়াও তিনি বাংলা ছবিতে কাজ করলেন  দস্যু মোহন, একদিন রাত্রে, রায় বাহাদুর, তমসা, বধূবরণ, প্রথম প্রেম প্রভৃতি ছবিতে। দুবার বিবাহ করেছেন। তিনি দূরদর্শনের ধারাবাহিকেও  অভিনয় করেছেন। পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে সিনেফোরাম অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার লাভ। এছাড়া উত্তরপ্রদেশ সাংবাদিক সংঘের পুরস্কার পেয়েছেন, কলা ভূষণ খেতাব পেয়েছেন, বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের পুরস্কার পেয়েছেন। জীবনের শেষ দিকটা তিনি অবশ্য কাটিয়েছিলেন কলকাতাতেই। সেখানে এক শুভানুধ্যায়ীর জন্যই তিনি বেঁচে ছিলেন। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। বারবার তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল। শেষে  ২০০১ সালের ২৭  অক্টোবর প্রদীপ কুমার আমাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু এমন সব স্মরণীয় ছবি তিনি আমাদের  দিয়ে গেছেন যার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরদিন।